Bangladesh News Network

লাদেনকে ধরিয়ে চিকিৎসককে চরম মূল্য চোকাতে হল

0 8,690

২ রা মে, ২০১১, রাত তখন গভীর। সারা পৃথিবী যখন গভীর নিদ্রায় মগ্ন, আমেরিকা তখন সমগ্র পৃথিবীকে সন্ত্রাস মুক্ত করার জন্য অত্যন্ত গোপনে নিজেদের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে। পরদিন সকালে উঠে বিশ্ববাসী সংবাদপত্রে চোখ রাখতে গিয়েই যেন রীতিমতো বিষম খাওয়ার জোগাড়! সকালে ঘুমচোখে উঠে সংবাদপত্রের খবর দেখে নিজের চোখকেও যেন বিশ্বাস করতে পারছিলেন না তারা! সমগ্র পৃথিবীর ত্রাস কুখ্যাত সন্ত্রাসবাদি ওসামা বিন লাদেন, যাকে কিনা খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছিল না, আমেরিকা নাকি তাকে খুঁজে রাতারাতি খতম করে ফেলেছে! সমগ্র বিশ্বকে রীতিমতো নাড়িয়ে দিয়েছিল এই খবর।

এই খবরে চোখ থাকলেও বিশ্ববাসীর অন্তর্দৃষ্টিতে তখন আরেকটি ঘটনার রিপিট টেলিকাস্ট চলছিল। ২৬/১১ এর আমেরিকার টুইন টাওয়ারে বিমান হামলার দৃশ্য! যার নেতৃত্ব দিয়েছিল লাদেন। পৃথিবীর ইতিহাসে সবথেকে ভয়াবহ সন্ত্রাসবাদী হামলা হিসেবে চিহ্নিত থাকবে ২৬/১১ এর ঘটনাটি। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে ২৬/১১ এর সেই অভিশপ্ত দিনটির ২০ বছর পূর্তি হবে। গত ২রা মে, লাদেনকে খতম করার ১০ বছর পূর্তি হয়েছে।

তবে আমেরিকা কিন্তু একার প্রচেষ্টায় পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে লাদেনের ঘাঁটিতে ঢুকে তাকে খতম করতে পারতো না যদি না পাকিস্তানেরই একজন বাসিন্দা আমেরিকাকে লাদেনের উপস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত খবর পাঠাতেন। কারণ সেইসময় লাদেনকে আশ্রয় দিয়েছিল পাকিস্তান। আমেরিকা বাইরে থেকে তার টিকিটিও ছুঁতে পারতো না।

আমেরিকার এমন ঐতিহাসিক সাফল্যের কান্ডারী যিনি ছিলেন তাঁর নাম শাকিল আফ্রিদি। অ্যাবোটাবাদে লাদেনের উপস্থিতি সম্পর্কে আমেরিকাকে “পাকা খবর” পাঠিয়ে ছিলেন তিনিই। পাকিস্তানের মাটিতে আমেরিকার চর হিসেবে গোপনে কাজ করে গিয়েছিলেন শাকিল আফ্রিদি। তাঁর পরিকল্পনা আগাম আন্দাজ করতে পারেনি কেউ। তবে লাদেনের মৃত্যুর পর পাকিস্তানের চোখে “গণশত্রু’, “দেশদ্রোহী’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিলেন তিনি। যার ফল তাঁকে আজও ভুগতে হচ্ছে।

পাকিস্তানের বাসিন্দা তথা আমেরিকার সিআইএ এর গোপন চর শাকিল আফ্রিদি দেশের মাটিতে গোপনে লাদেনের গতিবিধির উপর নজর রেখে চলেছিলেন। তবে লাদেনকে ধরা এত সহজ ছিল না। বিশেষত পাকিস্তান যখন তার সহায়। তবে আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও রীতিমতো নাছোড়বান্দা। ২৬/১১ এর কলঙ্কিত দিনের মূল চক্রি যে, সেই লাদেনকে খতম করা চাই-ই চাই।

সেইমতো অ্যাবোটাবাদে রহস্যময় পাঁচিল ঘেরা একটি বাড়ির উপর গোপনে নজর রাখছিলেন শাকিল আফ্রিদি। গোয়েন্দা বিভাগের কাছে খবর ছিল এই বাড়িতেই আত্মগোপন করে রয়েছে সমগ্র বিশ্বের ত্রাস। তবে নিশ্চিত খবর না পাওয়া পর্যন্ত ওই বাড়ির উপর হামলা চালাতে রাজি ছিলেন না বারাক ওবামা। সেই নিশ্চিত খবর আনবে কে? শাকিল আফ্রিদির উপর সে কঠিন দায়িত্বভার অর্পণ করা হয়।



পেশায় চিকিৎসক শাকিল তার দলবল নিয়ে ওই এলাকায় একটি ভুয়ো হেপাটাইটিস বি টিকাকরণ শিবিরের আয়োজন করেন। স্থানীয় প্রশাসনকে হাত করে শহরের স্বাস্থ্য দপ্তরকে বুদ্ধি করে সরিয়ে দিয়ে শাকিল নিজেই সমগ্র কর্মসূচির দায়িত্ব নিয়ে বসেন। বিষয়টিকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে ওই এলাকার দরিদ্র মানুষদের টিকাকরণ কর্মসূচির আওতায় আনা হয়। স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু করেন শাকিল আফ্রিদি।

তার সহকর্মীরা কেউ টেরই পাননি যে কত বড় আন্তর্জাতিক কর্মসূচির সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়েছেন তারা। শাকিল আফ্রিদির সরকারি মুখতার বিবির মতো কেউ কেউ হয়তো বিষয়টি সম্পর্কে কিছুটা আঁচ করেছিলেন। তবে তারা কখনোই ধরতে পারেননি শাকিলের আসল পরিকল্পনা কী হতে চলেছে। রহস্যময় পাঁচিল ঘেরা ওই বাড়িটিতে প্রবেশ করে লাদেনের উপস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়াটাও রীতিমতো চ্যালেঞ্জের ব্যাপার ছিল।



কিভাবে তারা এই কাজে সফল হলেন তার নির্দিষ্ট কোনো জবাব না পাওয়া গেলেও মনে করা হয় শাকিল আফ্রিদি টিকাকরণের আড়ালে লাদেনের পরিবারের কোনও সদস্যের ডিএনএর নমুনা সংগ্রহ করতে পেরেছিলেন। যা তিনি সরাসরি আমেরিকায় পাঠিয়ে দেন। এরপর বাকি কাজ করে আমেরিকা। আমেরিকার কাছে তখন লাদেনের বোনের ডিএনএ ছিল। সেই ডিএনএ মিলিয়েই ওই বাড়িতে লাদেনের উপস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছিল আমেরিকা।



এরপরেই বারাক ওবামার নির্দেশে ২রা মে, ২০১১ এর গভীর রাতে আমেরিকা থেকে পাকিস্তানের উদ্দেশ্যে উড়ে যায় আমেরিকান সৈন্যবাহিনীর হেলিকপ্টারগুলি। মাত্র ৪৫ মিনিটের ওই অপারেশনে পরিবারসহ লাদেন নিধন করেন আমেরিকার সেনারা। হোয়াইট হাউসে বসে তখন সম্পূর্ণ ঘটনাটির লাইভ ভিডিও দেখছিলেন বারাক ওবামা। “সন্ত্রাসবাদের আঁতুড়ঘর” হিসেবে পরিচিত পাকিস্তানের মাটিতেই লাদেনকে খতম করে সারাবিশ্বে শোরগোল ফেলে দিয়েছিল আমেরিকা।



সারা পৃথিবী জুড়ে তখন আমেরিকার জয়জয়কার। তবে এই জয়ের কৃতিত্ব যার পাওয়া উচিত ছিল সেই শাকিল আফ্রিদিকে পাকিস্তানের আদালত “দেশদ্রোহী” হিসেবে চিহ্নিত করে। উল্লেখ্য লাদেন নিধন অপারেশনের সঙ্গে শাকিল আফ্রিদির সরাসরি কোনও যোগসূত্র স্থাপন করতে পারেনি পাকিস্তান। তবুও বিদেশী সংস্থার হয়ে চরবৃত্তি করার অপরাধে ৩৩ বছরের জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন তিনি।

পাকিস্তানের কোনও এক কারাগারে নিভৃতবাসে জীবন যাপন করছেন শাকিল আফ্রিদি। পশ্চিমী গোয়েন্দাদের সঙ্গে হাত মেলালে তার কী ফলাফল হতে পারে, শাকিল আফ্রিদিকে কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে পাকিস্তানের প্রত্যেক বাসিন্দাকে তা বোঝাতে চেয়েছিল রাষ্ট্র! আমেরিকা অবশ্য প্রথম দিকে শাকিলের প্রতি পাকিস্তানের এমন কড়া মনোভাবের তীব্র বিরোধিতা করেছিল। তবে কোনও প্রতিবাদই তাকে কারাদন্ডের হাত থেকে রক্ষা করতে পারেনি। দেশের মাটিতে “দেশদ্রোহী” হিসেবে বন্দী আমেরিকা তথা সমগ্র পৃথিবীর “নায়ক” শাকিল আফ্রিদি আজও মুক্তির অপেক্ষায় দিন গুনছেন।

Comments
Loading...
%d bloggers like this: