পৃথিবী থেকে সাড়ে পঞ্চাশ লাখ বছর ধরে বিচ্ছিন্ন!

0
90

বিএনএন টিভি, বিঞ্জান ও প্রযুক্তি ডেস্কঃ

পৃথিবীর মধ্যেই পৃথিবীর মতো বিচ্ছিন্ন কিছু রয়েছে বলে বিশ্বাস করা কঠিন। যেখানে বাইরের কোনো নিয়ম প্রযোজ্য নয়। সেখানকার বাসিন্দারা অর্থ্যাৎ জীবরা বাইরের পৃথিবী থেকে সাড়ে পঞ্চাশ লাখ বছর ধরে বিচ্ছিন্ন। হা, এ রকম এক বিচিত্র-বিস্ময় হলো রোমানিয়ার মোভাইল গুহা।

১৯৮৬ সালে রোমানিয়ার কনস্টান্টা কাউন্টির ম্যাঙ্গালিয়া অঞ্চলে এ গুহা আবিষ্কার হয়। রোমানিয়া-বুলগেরিয়া সীমান্তে কৃষ্ণসাগরের উপকূল থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরেই এ প্রাকৃতিক বিস্ময় আবিষ্কার করেন বিজ্ঞানী ক্রিস্টিয়ান লাস্কু।

আশির দশকে রোমানিয়ায় কমিউনিস্ট শাসন চলাকালীন জনমানবহীন ম্যাঙ্গালিয়া প্রান্তরে চলছিল সয়েল টেস্ট। সেখানে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ সম্ভব কি না তা দেখা হচ্ছিল। তখনই ধরা পড়ে এ রহস্যজনক বিষাক্ত গুহার অস্তিত্ব।

অদ্ভুত বাস্তুতন্ত্রের সাক্ষী এ গুহা। এখানে প্রচুর পরিমাণে হাইজ্রোজেন সালফাইড ও কার্বন ডাই অক্সাইড রয়েছে। বদ্ধ হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই এখানে অক্সিজেন কম। ফলে এ গুহার বিষাক্ত পরিবেশে ফোটোসিন্থেসিস (সালোকসংশ্লেষ)-এর বদলে কেমোসিন্থেসিস প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জীবন এগিয়েছে।

ফোটোসিন্থেসিসের বিপরীত প্রক্রিয়া হল কেমোসিন্থেসিস। ফোটোসিন্থেসিসে কার্বন ডাই অক্সাইড গ্রহণ করে পরিবেশে মুক্ত হয় অক্সিজেন। কিন্তু কেমোসিন্থেসিসে হাইড্রোজেন সালফাইড, কার্বন ডাই অক্সাইড এবং সামান্য অক্সিজেন অথবা নাইট্রেটের বিক্রিয়ায় প্রচুর পরিমাণে সালফার উৎপন্ন হয়। অক্সিজেনের অনুপস্থিতিতেও এ প্রক্রিয়া হতে পারে।

অতল মহাসাগরের গভীরে, অন্ধকার গুহা-সহ পৃথিবীর বহু অংশে এ কেমোসিন্থেসিস প্রক্রিয়ায় বাস্তুতন্ত্র আবর্তিত হয়। ঠিক সে ভাবেই হয়েছে মোভাইল গুহাতেও।

প্রকৃতির নিয়মে এ গুহায় বায়ুমণ্ডল পৃথিবীর বাকি অংশের তুলনায় আলাদা। সাধারণত পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের গ্যাসীয় অনুপাতের ২১ শতাংশ অক্সিজেন। কিন্তু মোভাইল গুহায় অক্সিজেনের উপস্থিতি মাত্র ৭-১০ শতাংশ।

কিন্তু কার্বন ডাই অক্সাইডের ক্ষেত্রে এ অনুপাত ঠিক উল্টো। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে এ গ্যাসের পরিমাণ যেখানে ০.০৪ শতাংশ, সেখানে মোভাইল গুহায় কার্বন ডাই অক্সাইড আছে ২ থেকে ৩.৫ শতাংশ।

এ গুহায় মিথেনের পরিমাণ ১ থেকে ২ শতাংশ। পাশাপাশি মোভাইল গুহার বাতাস এবং জলে প্রচুর পরিমাণে হাইজ্রোজেন সালফাইড ও অ্যামোনিয়া আছে।

রহস্যজনক এ গুহায় বাস করা ৪৮টি প্রজাতির প্রাণীকে শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৩৩টির বাইরের পৃথিবীতে অস্তিত্বই নেই। গুহার জীবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল জোঁক, সহস্রপদী, শামুক, মাকড়সা ও ওয়াটার স্করপিয়ন।

ডাঙায় দেখা কাঁকড়া বিছের সঙ্গে এখানকার পানির কাঁকড়া বিছের চরিত্রগত মিল আছে। তবে মানুষের জন্য এগুলো ডাঙার কাঁকড়া বিছের তুলনায় কম বিষাক্ত।

এ গুহায় খাদ্যশৃঙ্খলও নির্ভর করছে কেমোসিন্থেসিসের উপর। মিথেন ও সালফারে (গন্ধক) জারিত হয় ব্যাকটেরিয়া। বিক্রিয়ার ফলে বাতাসে নিউট্রিয়েন্ট বা পরিপোষকের উপস্থিতি বাড়ে। তার দ্বারা ছত্রাক ও অন্যান্য ব্যাকটেরিয়া পুষ্টি পায়।

এ বিক্রিয়া-শৃঙ্খলের ফলে গুহার দেয়ালে জন্ম নেয় মাইক্রোবিয়াল ম্যাটস। মাইক্রোবিয়াল ম্যাট হল একাধিক স্তরের মাইক্রোঅর্গানিজমের চাদর। পুরু শ্যাওলার মতো বিছিয়ে থাকা এ অংশ থেকে খাদ্যগ্রহণ করে তৃণভোজীরা। আবার তারা খাদ্য হয়ে ওঠে মাংসাশীদের কাছে। এভাবেই কেমোসিন্থেসিসের উপর নির্ভর করে এগোতে থাকে খাদ্য-খাদক শৃঙ্খল।

বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, মোভাইল গুহার জীববৈচিত্র্য সাড়ে পঞ্চাশ লাখ বছর ধরে লোকচক্ষুর আড়ালে ছিল ঠিকই। কিন্তু তার মানে এই নয় আজ থেকে সাড়ে পঞ্চাশ লাখ বছরের আগে এ গুহায় একসঙ্গে সব প্রাণী সৃষ্টি হয়েছে।

গবেষকদের ধারণা, এ গুহায় প্রথমে ব্যাকটেরিয়ার সৃষ্টি হয়েছিল। তার পর কোনোভাবে গুহায় প্রাণীরা বাইরে থেকে ঢুকে পড়ে। তার পর থেকে এখানেও চলেছে তাদের জীবনচক্র। প্রাকৃতিক নিয়মের শৃঙ্খল অনুযায়ীই আবর্তিত হয়েছে সেই চক্র। শুধু বাইরের জগতের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক ছিল না। সে বেঁচে থেকেছে তার নিজের নিয়ম মতো। তুষার যুগে সারা পৃথিবী প্রাণহীন হয়ে পড়লেও এ গুহার জীবজগৎ রক্ষা পেয়েছিল বলে ধারণা বিজ্ঞানীদের।

সূর্যালোক না পাওয়ায় এ গুহার প্রাণীরা অনেকে জন্মান্ধ। কারণ, দীর্ঘ দিন অন্ধকারে চোখের ব্যবহার না থাকায় জিনগত বিবর্তনের ফলে সদ্যোজাতদের শরীরে চোখের গঠন হয়নি। এমনকি, সূর্যের অনুপস্থিতিতে পিগমেন্টেশনের জেরে তাদের গায়ের রং ও স্বাভাবিক নয়।

-আনন্দবাজার অনলাইন