নির্জন সৈকতে জাগছে সাগরলতা, দলে দলে ফিরছে লাল কাঁকড়া

0
112

করোনাভাইরাসে সারাবিশ্ব স্তব্ধ। একুশ শতকের এই বিশ্বায়নের যুগে যেটা একদম অকল্পনীয়। শিল্প-কারাখানা আর মানুষের নৈরাজ্যে পৃথিবী নিয়ত অবাসযোগ্য হয়ে উঠছে। ঠিক সেই মুহূর্তে প্রকৃতিই যেনো তার রূপ ফিরিয়ে আনতে সব ভার নিয়েছে। এক অদৃশ্য অণুজীবের কাছে পরাজিত হয়ে থমকে গেছে মানবসভ্যতা। সেই অণুজীব করোনাভাইরাসের আক্রমণ বাংলাদেশকে কঠিন অবস্থায় ফেলে দিয়েছে। মাত্র কয়েকদিনের নিষেধাজ্ঞায় পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতজুড়ে এখন কেবলই নির্জনতা। শুধু রয়েছে অশান্ত সাগরের একের পর এক ঢেউ আছড়ে পড়ার শব্দ।

এমন নির্জনতা বহুদিন উপভোগ করেনি কক্সবাজারবাসী। যেন হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত। বালিয়াড়িতে মানুষের বিচরণ না থাকায় অবাধ ঘুরে বেড়াচ্ছে লাল কাঁকড়ার দল। অন্যদিকে ডালপালা মেলতে শুরু করেছে সাগরলতা। জমতে জমতে বড় হচ্ছে বালিয়াড়ি। এরমধ্যে একদম লোকালয়ের কাছে এসেই ডিগবাজিতে মেতেছে একদল ডলফিন।

সমুদ্রসৈকতে প্রকৃতির রাজ্যে এমন পরিবর্তন ইতিবাচকভাবে দেখছেন পরিবেশবিদেরা। তারা বলছেন- এসব প্রাণ-প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সৈকতের কিছু কিছু অংশে প্রকৃতিবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ জরুরি।

কক্সবাজারে পরিবেশ নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করেছে বিশ্বজিত সেন বাঞ্চু। তিনি বলেন, সমুদ্রসৈকতে মাটির ক্ষয়রোধ ও শুকনো উড়ন্ত বালুরাশি আটকে বালিয়াড়ি তৈরির মূল কারিগর হচ্ছে সাগরলতা। বালিয়াড়িকে সাগরের রক্ষাকবচও বলা হয়। কারণ ঝড়-তুফান, ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে কারণে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসের সময় উপকূলকে ভাঙনের কবল থেকে রক্ষা করে এসব বালিয়াড়ি। মানুষের কোলাহলমুক্ত সৈকত পেয়ে এখন আবার উঁকি দিচ্ছে সেই সাগরলতা। এটি পরিবেশের জন্য খুব ইতিবাচক।

তিনি বলেন, মাত্র এক দশক আগেও কক্সবাজার শহর থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সৈকতজুড়ে গোলাপি-অতিবেগুনি রঙের ফুলে ভরা সাগরলতা দেখা যেত। যা পর্যটকদের কাছেও ছিল অন্য রকম আকর্ষণ। কিন্তু আমাদের অতি বাড়াবাড়ির কারণে আজ তা হারিয়ে গেছে। কিন্তু করোনা পরিস্থিতিতে সাগরের নির্জনতার সুযোগে সমুদ্রসৈকত তার নিজস্বতা ফিরে পেয়েছে।

কক্সবাজার পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আয়াছুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, সমুদ্রসৈকতে মানুষের অবাধ বিচরণের কারণে সেখানকার প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য এখন হুমকির মুখে। এক সময় সৈকতজুড়ে দেখা যেত লাল কাঁকড়ার দৌড়ঝাঁপ। সেই দৃশ্য এখন আমরা হারাতে বসেছি। আশার কথা হলো, অন্তত এই দুর্যোগময় মুহূর্তে হলেও প্রকৃতি তার নিজের পরিবেশ ফিরিয়ে পেয়েছে।

তিনি বলেন, এতদিন পরে ডলফিনের ঝাঁক লোকালয়ের একদম কাছে এলো। এতেই আমাদের বুঝতে হবে, এতদিন মানুষের ভিড়ের কারণে আসার পরিবেশ পায়নি। আমাদের উচিত প্রাণ-প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য বাঁচানো। পর্যটনের স্বার্থে পুরো সৈকতে পারা না গেলেও সৈকতের বিশেষ বিশেষ অংশ যেন প্রকৃতিবান্ধব, পরিবেশবান্ধব রাখা হয় যাতে এসব প্রাণী নিজেদের মতো করে বাঁচতে পারে, সাগরলতা আপন বলয়ে বিস্তার ঘটতে পারে।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, সৈকতের পরিবেশগত পুনরুদ্ধারে সাগরলতার মতো দ্রাক্ষালতা বনায়নের মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ফ্লোরিডা এবং অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় সৈকতের হ্যাস্টিং পয়েন্টসহ বিশ্বের বিভিন্ন সৈকতে বালিয়াড়ি সৃষ্টিতে সফল হয়েছেন বিজ্ঞানীরা। তাদের দেখানো পথে সৈকতের মাটির ক্ষয়রোধ ও সংকটাপন্ন পরিবেশ পুনরুদ্ধারে বিশ্বের দেশে দেশে কাজে লাগানো হচ্ছে সাগরলতাকে।

উন্নত বিশ্বের গবেষণালব্ধ ফলাফলে সাগরলতার মতো দ্রাক্ষালতা সৈকত অঞ্চলে পরিবেশগত পুনরুদ্ধার ও মাটির ক্ষয় রোধের জন্য একটি ভালো প্রজাতি বলে প্রমাণিত। সাগরলতা ন্যূনতম পুষ্টিসমৃদ্ধ বেলে মাটিতে বেড়ে উঠতে পারে। তার পানির প্রয়োজনীয়তাও কম হয়। উচ্চ লবণাক্ত মাটিও তার জন্য সহনশীল। এর শিকড় মাটির তিন ফুটের বেশি গভীরে যেতে পারে।

এটি দ্রুতবর্ধনশীল একটি উদ্ভিদ। বাইরের কোনো হস্তক্ষেপ না হলে লতাটি চারিদিকে বাড়তে থাকে এবং সর্বোচ্চ সামুদ্রিক জোয়ারের উপরের স্তরের বালিয়াড়িতে জাল বিস্তার করে মাটিকে আটকে রাখে। এরপর বায়ু প্রবাহের সঙ্গে আসা বালি ধীরে ধীরে সেখানে জমা হয়ে মাটির উচ্চতা বাড়ায়। এতে সাগরলতার ও সৈকতের মাটির স্থিতিশীলতা তৈরি হয়। সাগরলতার ইংরেজি নাম রেলরোড ভাইন, যার বাংলা শব্দার্থ করলে দাঁড়ায় রেলপথ লতা। আসলেই রেলপথের মতোই যেন এর দৈর্ঘ্য। একটি সাগরলতা ১শ ফুটেরও বেশি লম্বা হতে পারে। এর বৈজ্ঞানিক নাম ‘Ipomea pes caprae’।

পরিবেশ বিজ্ঞানী ড. আনসারুল করিম গণমাধ্যমকে বলেন, কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সমুদ্রের তীর ধরে ২০ থেকে ৩০ ফুট উঁচু পাহাড়ের মতোই বড় বড় বালির ঢিবি ছিল। এসব বালিয়াড়ির প্রধান উদ্ভিদ ছিল সাগরলতা। সাগরলতার গোলাপি-অতিবেগুনি রঙের ফুলে সৈকতে এক অন্য রকমের সৌন্দর্য তৈরি হতো। কিন্তু সাগরলতা ও বালিয়াড়ি হারিয়ে যাওয়ায় গত প্রায় তিন দশকে কক্সবাজার সৈকতের ৫শ মিটারের বেশি ভূমি সাগরে বিলীন হয়ে গেছে।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ও বনবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. কামাল হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, সাগরলতা হলো সৈকতের সুস্থতার পরিচায়ক। এগুলো বালিকে ধরে রেখে বালিয়াড়ি সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে, তাই এ উদ্ভিদকে সৈকতের বাস্তুতন্ত্রের অগ্রপথিক বলা হয়।

তিনি বলেন, মানুষ সরে গেছে তাই এগুলো আবার ফিরে আসছে সৈকতে যা খুবই আশাব্যঞ্জক দিক। মানুষের অতি আনাগোনায় সাগরতলা হারিয়ে যায়। তাই আমাদের উচিত হবে সৈকতের সুস্থতা ধরে রাখতে এখনই পদক্ষেপ নেয়া।