কল্যাণীর বাবার কোনো স্বীকৃতি নেই কেন!

0
136

বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে শত্রুদের বুলেটে ঝাঁঝরা হয়েছে বাবার বুক। শেষবারের মতো বাবার মুখ দেখতে না পারার যন্ত্রণা আজও কাঁদায় কল্যাণী রানীকে। গাইবান্ধা শহরের ডেভিড কোম্পানী পাড়ার বাড়িতে বাবার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে চোখের জলে বুক ভেসে যায় কল্যাণীর।

কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন একাত্তরে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্ততি নিচ্ছিলেন। সদরের বল্লমঝাড়ের ইউসুবপুর গ্রামে বাবা-মা আর ৫ ভাইবোনের সংসার। ভাই-বোনরা সবাই ছোট ছোট। একাত্তরের মে মাসের কোনো একদিন পাক-বাহিনীর দোসররা তার বাবা ননী গোপাল সাহাকে ধরে নিয়ে যায়।

এরপর স্টেডিয়ামে বেশ কয়েকজনের সাথে তার বাবার বুকেও বুলেট চালায়। মা-আর ভাই-বোনদের নিয়ে কল্যাণীকে নামতে হয় অজানা এক যুদ্ধে। সেলাই ফোড়াই আর এর ওর কাছে চেয়ে চিন্তে নিজের আর ভাইবোনদের লেখাপড়ার খরচ জুগিয়েছেন। কল্যাণীর আক্ষেপ, যারা মুক্তিযুদ্ধে গেছেন তারা মুক্তিযোদ্ধা, যারা মারা গেছেন তারা শহীদ। তাহলে দেশের জন্য তো তার বাবাও জীবন দিয়েছেন তার কোনো স্বীকৃতি নেই কেন।

একই পাড়ার রামকৃষ্ণ রায়। মাত্র ছয় মাস বয়সে বাবাকে হারিয়েছেন। বাবার স্নেহ-ভালোবাসা কোনটাই জোটেনি তার কপালে। বাবার মুখটা কেমন ছিল- এমন ভেবে প্রায়ই নির্ঘুম রাত কাটে তার। মায়ের মুখে শুনেছেন হোমিও চিকিৎসক হিসেবে এলাকায় বেশ সুখ্যাতি ছিল তার বাবা ডা. বিজয় কুমার রায়ের। নাট্যকর্মী হিসেবেও সুনাম ছিল তার।

একাত্তরের ২০ মে তার বাবা সহ ২৪ জনকে একসাথে ধরে নিয়ে যায় পাক-বাহিনী ও তাদের দালালরা। একজন ছাড়া বাকী সবাইকে গুলি করে হত্যার পর তাদের লাশ পুঁতে রাখে স্টেডিয়াম সংলগ্ন বধ্যভূমিতে। ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের নিয়ে অথৈ সাগরে ভেসে বেড়ান তার মা। একদিন দেশে স্বাধীনতার সূর্য ওঠে। সবাই বিজয় উল্লাস করে। কিন্তু পিতৃহারা রামকৃষ্ণ ও তার পরিবারের সদস্যরা তখন স্বজনহারানোর বেদনায় কাতর।

রামকৃষ্ণ বলেন, দেশ স্বাধীনের পর জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু ছাড়া কেউ তাদের খবর নেয়নি। দেশ শত্রুমুক্ত হবার পর সমবেদনা-কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তার পরিবারকে একটি পত্র আর নগদ দুই হাজার টাকা দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এরপর ৫০ বছর পেরিয়েছে। দেশের অনেক পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু দেশের জন্য আত্মবলিদান দিয়েও তার বাবার কোনো স্বীকৃতি জোটেনি। কেউ কোনো দিন খোঁজও নেয়নি।

গোপনে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তার অপরাধে একাত্তরের বৈশাখে শত্রুদের হাতে ধরা পড়েন গাইবান্ধা শহরের কালিবাড়ি পাড়ার ব্যবসায়ী প্রকাশ চন্দ্র চক্রবর্তী। পরবর্তীতে তার লাশটাও পাওয়া যায়নি। তার আগেই দু’শ ভরি সোনা আর নগদ টাকার সবই লুট করে ঘাতকদের দোসররা। আট মাসের কোলের শিশু প্রতিমা চক্রবর্তী, দুই বছরের ছেলে প্রবীর চক্রবর্ত্তী আর বড় মেয়ে প্রীতি চক্রবর্তীকে (৪) নিয়ে তীর হারা ঢেউয়ের সাগরে ভাসতে থাকেন প্রকাশ চক্রবর্তীর স্ত্রী মুক্তা রানী চক্রবর্ত্তী।

মুক্তারানী বলেন, তার স্বামী সেদিন বাড়ি থেকে যাওয়ার আগে বলছিলেন, মুক্তিযোদ্ধারা দেশের জন্য যুদ্ধ করছে তাদেরতো খাওয়া-দাওয়া লাগবে। ওদের কিছু টাকা দিয়ে বাড়ি ফেরার কথা বলে চলে যান। আর ফিরে আসেননি। পরবর্তীতে জানা যায় তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। বাড়িতে দু’শ ভরি সোনার গহনা, ৫০ হাজার চান্দির টাকা সবই লুট হয়ে যায়।

এরপর দু’মুঠো ভাত খাওয়ার বাসনটাও ছিল না। ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের নিয়ে ৮০ ক্রোশ পথ পায়ে হেঁটে স্বজনদের সন্ধানে চলে যান পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে। ছেলে-মেয়েদের পা ফুলে যায়। ওরা যেতে চায় না। বারবার বাবা বাবা বলে ডাকে। মা তুমি বাবাকে রেখে কোথায় যাচ্ছো বাবার কাছ থেকে আমাদের দূরে নিয়ে যাচ্ছো কেন। শিশুদের এমন উচ্চারণে বুক ভেঙে যায় মুক্তা রানির। তারপরও সব কষ্ট পাথর চাপা দিয়ে সন্তানদের মিথ্যে সান্ত্বনা দেন তোমাদের বাবা আসবে।

এমন অনেক হৃদয় বিদারক গল্প আছে গাইবান্ধা জেলার আনাচে-কানাচে অনন্ত: ১শ’ ৩৬টি পরিবারে। যাদের ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা পর মাটির নিচে গর্ত করে লাশ পুঁতে ফেলা হয়।

গাইবান্ধা নাগরিক পরিষদের আহবায়ক অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম বাবু বলেন, এই মানুষগুলো দেশের জন্য জীবন দিল অথচ এতদিন পরও তাদের কোনো তালিকা নেই, স্বীকৃতি নেই, এটা একটা স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য লজ্জাষ্কর।

রাজনীতিক মিহির ঘোষ বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা নিয়ে প্রায়ই বিতর্ক হয়। অনেক ভুয়া নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয় কিন্তু এই মানুষগুলো যারা শহীদ হলেন তারা কেন শহীদের মর্যাদা পাবে না, এটা বোধগম্য নয়।

মুক্তিযুদ্ধ গবেষক অধ্যাপক জহুরুল কাইয়ুম বলেন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে যাদের হত্যা করা হয়েছে তাদের অনেকের স্ত্রী সন্তানরাও বেঁচে নেই। এখনও যারা বেঁচে আছে এখনই তাদের নাম-ঠিকানা সংগ্রহ করে তাদের একটি তালিকা প্রস্তত করার মধ্যদিয়ে শহীদদের ডাটাবেজ করতে পারলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আরো সমৃদ্ধ হবে।

গাইবান্ধায় বেসরকারিভাবে গণহত্যা বধ্যভূমি ও গণকবর জরিপ অনুযায়ী, একাত্তরের আটটি নির্যাতন কেন্দ্র ছাড়াও জেলা সদরে স্টেডিয়াম সংলগ্ন বধ্যভূমিসহ জেলার সাত উপজেলায় দশটি বধ্যভূমি ও দশটি গণকবরে ১৩৬ জন মানুষকে হত্যা করা হয়। যাদের রাষ্ট্রীয় কোনো স্বীকৃতি নেই।