Bangladesh News Network

করোনার তৃতীয় ঢেউয়ের কবলে পড়তে পারে ভারত

0 1,260


এপ্রিল ও মে মাসে করোনাভাইরাস মহামারীর দ্বিতীয় ঢেউয়ের ধাক্কা সামলে কেবলই একটু একটু করে বিধিনিষেধের বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে ভারত। এ অবস্থায় বিশেষজ্ঞরা এখন সতর্ক করে বলছেন, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে ভারত করোনাভাইরাসের তৃতীয় ঢেউয়ের কবলে পড়তে পারে। এই ঢেউ দেশটি ঠেকাতে পারবে কি-না সে প্রশ্নেরই উত্তর খোঁজা হয়েছে বিবিসি’র এক প্রতিবেদনে।

কয়েকজন বিশেষজ্ঞ সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ভারতে ১২ থেকে ১৬ সপ্তাহের মধ্যে করোনাভাইরাসের তৃতীয় ঢেউ আসতে পারে। এমন প্রেক্ষাপটে এ ব্যাপারে ভারতের বিভিন্ন রাজ্য সরকার তাদের প্রস্তুতি নিয়ে আদালতের প্রশ্নের মুখে পড়েছে। অনেকেই আবার করোনাভাইরাসের ডেল্টা ধরনের পর আসা নতুন ধরন ‘ডেল্টা প্লাস’ মোকাবেলায় বিদ্যমান সব টিকা কাজ করবে কি-না তা নিয়ে উদ্বিগ্ন।

করোনাভাইরাসের ডেল্টা ধরনের সঙ্গে ডেল্টা প্লাসের সংশ্লিষ্টতা আছে। ভারতে গতবছর প্রথমে ডেল্টা ধরনই শনাক্ত হয়েছিল। এই ধরনের কারণে দেশটিতে মহামারীর দ্বিতীয় ঢেউ অনেক বেশি প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। তবে মহামারীর নতুন ঢেউ আসা নিয়ে শঙ্কা কতটুকু বাস্তবসম্মত? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতে করোনাভাইরাস মহামারীর আরেকটি ঢেউ আসার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু সেই ঢেউয়ের ভয়াবহতা এবং বিস্তার কেমন হবে, তা কিছু বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে।

কোভিড সুরক্ষা প্রটোকল:

ভারতে করোনাভাইরাস সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ তুঙ্গে ছিল গত মে মাসে। সে সময় দিনে চার লাখের বেশি রোগী ভাইরাস শনাক্ত হচ্ছিল। কিন্তু কিছুদিন ধরে ভারতে এই হার কমে গড়ে দৈনিক ৫০ হাজারের কিছু বেশি রোগী কোভিড শনাক্ত হচ্ছে। সংক্রমণ কমার ক্ষেত্রে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে আরোপ করা কড়া লকডাউনের একটি বড় অবদান রয়েছে।

ভারতে মহামারীর দ্বিতীয় ঢেউয়ের জন্য বাজারে মানুষের ভিড়, নির্বাচনী সভা-সমাবেশ, ধর্মীয় উৎসবকে দায়ী করা হয়েছে। তাছাড়া, সরকারের বাজে নীতিগত সিদ্ধান্ত, নজরদারিতে ঘাটতি, আগাম সতর্কতা আমলে না নেওয়ার মতো বিষয়গুলোও এক্ষেত্রে দায়ী। এই ভুলগুলোর পুনরাবৃত্তি হলে ভারতে মহামারীর তৃতীয় ঢেউও বিধ্বংসী হতে পারে বলেই অভিমত বিশেষজ্ঞদের।

স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও সরকারি নীতি বিশেষজ্ঞ চন্দ্রকান্ত লাহারিয়া বলেন, ভারত আবারও একটি নাজুক পর্যায়ে চলে এসেছে। এ অবস্থায় করোনাভাইরাসের পরবর্তী ঢেউ কেমন হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে মানুষের আচরণের ওপর।

সংক্রমণ কমতে থাকলে রাজ্যগুলোকে ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালু করার পক্ষে মত দিয়েছেন চন্দ্রকান্ত। এ বিষয়ে তিনি বলেন, “আমরা তাড়াহুড়ো করে সবকিছু চালু করতে গেলে মানুষ যদি করোনাভাইরাস থেকে সুরক্ষার প্রটোকল অনুসরণ না করে, তাহলে ভাইরাসকে কেবল আরও দ্রুত ছড়িয়েই দেওয়া হবে।”

পরামর্শ দিয়ে চন্দ্রকান্ত বলেন, সুরক্ষাবিধি স্থানীয় পর্যায়ে বাস্তবায়ন করতে হবে। সেখানে কেউ এই প্রটোকল না মানলে শাস্তির ব্যবস্থা করা উচিত।

নতুন ধরন কি হুমকি হয়ে উঠতে পারে?

ভারতে করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউয়ের জন্য ডেল্টা ধরনকেই প্রধানত দায়ী করা হয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সংবেদনশীল জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভাইরাস ছড়াতে দিলে ভবিষ্যতে করোনাভাইরাসের আরও অনেক ধরনের প্রাদুর্ভাব ঘটতে পারে।

ভারতে নতুন শনাক্ত ডেলটা প্লাস ধরনকে সরকার ইতোমধ্যেই ‘উদ্বেগজনক’ বলে ঘোষণা করেছে। তাই বলে এই ধরন যে তৃতীয় ঢেউ নিয়ে আসতে পারে তা বলার মতো পর্যাপ্ত তথ্য এ মুহূর্তে নেই। তবে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলছেন, পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই।

মহামারী বিশেষজ্ঞ ললিত কান্ত বলছেন, ভাইরাস যতক্ষণ ছড়াতে থাকবে, ততক্ষণ নতুন ধরনের প্রাদুর্ভাব ঘটা এবং তা বিস্তারের আশঙ্কা থাকবে। এজন্য বিপজ্জনক ধরনগুলো আগেভাগেই শনাক্ত করতে সিকোয়েন্সিং সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি ভাইরাসের বিস্তার ঠেকানোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

চলতি মাস পর্যন্ত ভারত করোনাভাইরাসের ৩০ হাজার নমুনার সিকোয়েন্সিং করেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ সংখ্যা পর্যাপ্ত নয়, সিকোয়েন্সিং আরও বেশি করে করা উচিত। হাজার হাজার কোভিড রোগীকে চিকিৎসাসেবা দেওয়া চিকিৎসক ফাতহাহুদীন বলেন, করোনাভাইরাসের বিদ্যমান ধরন মোকাবেলায় টিকা কাজ করছে বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে, কিন্তু নতুন ধরনের বিরুদ্ধে এ টিকা কাজ করবে কি না, তার কোনও নিশ্চয়তা নেই। কারণ, টিকা নেওয়ার পরও দেখা যাচ্ছে মানুষ ভাইরাস আক্রান্ত হচ্ছে।

ফাতহাহুদীন মনে করেন, ভারতে করোনাভাইরাসের আরেকটি ঢেউ অবশ্যম্ভাবী। তবে যথাযথ ব্যবস্থা নিলে সেই ঢেউয়ের আগমন বিলম্বিত করা কিংবা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। এসব ব্যবস্থার মধ্যে আছে সিকোয়েন্সিং, মিউটেশনের ওপর নজর রাখা এবং সুরক্ষা প্রটোকলের কঠোর প্রয়োগ।

যথেষ্ট রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং টিকা সুরক্ষা:

তৃতীয় ঢেউ কেমন হবে তা নির্ভর করছে ভারতের মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার মাত্রা ওপরও, যে ক্ষমতা গড়ে উঠতে পারে অতীতে কোভিড আক্রান্ত হওয়া থেকে কিংবা টিকা দেওয়া থেকে।

৯ এবং ২২ জুনের মধ্যে ভারতে গড়ে দৈনিক ৩২ লাখ ৫০ হাজার ডোজ টিকা মানুষকে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এবছরের শেষ নাগাদ প্রাপ্তবয়স্কদেরকে টিকা সুরক্ষার আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে গেলে ভারতকে দৈনিক ৮৫ লাখ থেকে ৯০ লাখ মানুষকে টিকা দিতে হবে।

এ পর্যন্ত ভারতীয়দের মাত্র ৪ শতাংশ পুরোপুরি টিকা নিয়েছে এবং প্রায় ১৮ শতাংশ মানুষ মাত্র ১ ডোজ টিকা নিয়েছে। মহামারী বিশেষজ্ঞ চন্দ্রকান্ত বলেন, টিকাদানের হার দ্রুতই বাড়ানো না গেলে এখনও লাখ লাখ মানুষ নাজুক পরিস্থিতিতেই থেকে যাবে।

যদিও অতীতের কোভিড সংক্রমণ থেকে মানুষ সুরক্ষা পেতে পারে। কিন্তু কোভিড সংক্রমণ থেকে এই ভাইরাস প্রতিরোধে কার মধ্যে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে তা নির্ধারণ করা কঠিন। ভারতের অনেক শহর-নগর-গ্রামেই কোভিড পরীক্ষার জন্য মানুষকে রীতিমত সংগ্রাম করতে হচ্ছে। ফলে কে কোভিড আক্রান্ত হয়েছে বা হয়নি তা জানার উপায় নেই।

এ পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা সবাই একটি ব্যাপারে একমত যে, ভারতে করোনাভাইরাসের প্রাণঘাতী সব ধরনের প্রাদুর্ভাব ঘটার হুমকি যেমন আছে, তেমনি জনসংখ্যার একটি বড় অংশই এখনও ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকিতে আছে। তাই মানুষজনের কোভিড-কে হালকাভাবে নেওয়ার কোনও সুযোগ নেই।

চিকিৎসক ফাতহাহুদীন মনে করেন, তৃতীয় ঢেউ ভারত সামাল দিয়ে উঠতে পারবে কিনা সে ব্যাপারে কোনও নিশ্চয়তা নেই। তাই একবছরেরও বেশি সময় ধরে চলা এই মহামারীর লড়াইয়ে স্বাস্থ্যসেবা কর্মীরাসহ সবারই সচেতন থাকতে হবে, হাল ছেড়ে দিলে চলবে না।

Comments
Loading...
%d bloggers like this: