ইরফান খানের মৃত্যুর আগের শেষ চিঠি

0
167

অনিক চৌধুরী, বার্তা সম্পাদকঃ

অভিনেতা ইরফান খান লিখেছেন,

“বেশ কিছুদিন হল জানতে পেরেছি আমার হাই-গ্রেড নিউরোএন্ডোক্রিন ক্যানসার হয়েছে। আমার শব্দকোষে এক্কেবারে নতুন এই শব্দবন্ধ। জানতে পেরেছি এই রোগ এতটাই বিরল যে এর নির্দিষ্ট কোনও চিকিত্‍সা পদ্ধতিও নেই। অতএব এক অনির্দিষ্ট ট্রায়াল অ্যান্ড এরর গেমের মধ্যে দিয়ে এগিয়েছি আমি।

এতদিন আমি কিন্তু এক অন্য দুনিয়াতেই বুঁদ হয়ে ছিলাম… অনেক স্বপ্ন, পরিকল্পনা, উচ্চাকাঙ্খার ডানায় ভর দিতে দ্রুত গতির ট্রেনে যেন সওয়ার ছিলাম।

হঠাত্‍ই ছন্দপতন।

যেন কোনও টিকিট চেকার এসে কাঁধে টোকা মেরে জানিয়ে গেলেন আমার সফর শেষ… এবার নেমে যেতে হবে। এদিকে আমি হতবাক। তর্ক করছি, না, এটা আমার স্টেশন নয়… তবুও তিনি বলে চলেছেন—হ্যাঁ, এখানেই নামতে হবে। এমনই হয়তো হয় জীবনে চলার পথে। ঘটনার আকস্মিকতায় অনুভব করলাম এক চরম সত্যি।

এই বিশাল বিশ্বের ভাসমান জীবন স্রোতে মানুষ শুধুমাত্র এক শক্তিহীন কর্কের থেকে বেশি কিচ্ছু নয়। তবুও আমরা সেই জীবনকেই নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ি।

অসুখের কথা জানার পরে হাজার অনিশ্চয়তার মধ্যেও ছেলের কাছে বার বার বলেছি ভয় এবং অনিশ্চয়তা যেন আমাকে দমিয়ে দিতে না পারে। কিন্তু এরই মধ্যে হঠাত্‍ করেই চুড়ান্ত যন্ত্রণা আমাকে গ্রাস করল। কোনও সান্ত্বনা, কোনও প্রেরণাই কাজ করছিল না। ঈশ্বরের থেকেও যন্ত্রণা বড় হয়ে উঠেছিল।

জানেন, গতবার অসুস্হ হওয়ার সময় আমার হাসপাতাল ছিল ক্রিকেটের মক্কা লর্ডস স্টেডিয়ামের বিপরীতে। আমার স্বপ্নের মক্কা… এত যন্ত্রণা, এত কষ্টের মধ্যেও একদিন হাসপাতালের ঘরের জানলায় দাঁড়িয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে হঠাত্‍ই এক অন্যরকম উপলব্ধি হল।

জীবন ও মৃত্যুর মধ্যে শুধু এক রাস্তার ফারাক। প্রথমবার বুঝলাম মুক্তির স্বাদ কী…মনে হল এই প্রথম যেন জীবনকে সঠিক অর্থে চিনতে পারলাম।

ঠিক করলাম, না, হেরে যাব না। লড়াইটা আমাকে চালিয়ে যেতেই হবে।” কিন্তু লড়াইটা করতে পারলাম কই! আজ হয়তো বা শেষ গন্তব্যে পৌছে গেছি। মা কে হারিয়ে যাওয়ার পথটা বুঝি আরো স্পষ্ট হলো। এবার বুঝি সময় হলো চলে যাওয়ার।

হায়রে জীবন, আহারে জীবন!